সমাজ পরিবর্তনে আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব

0
59

সময় ও সমাজের বিরুদ্ধে মানুষের অভিযোগ বিস্তর। কান পাতলেই বলতে শোনা যায়, সময় বড়ই খারাপ, মানুষের মন থেকে বিশ্বাস ও ধর্মানুরাগ বিদায় নিয়েছে, ভদ্র ও শালীনতার মৃত্যু হয়েছে, মানুষ আল্লাহ ও পরকাল থেকে বিমুখ। এসব অভিযোগ অসত্য নয়। জীবন ও সমাজের যেদিকেই তাকাবেন স্খলনের ঝড় দেখতে পাবেন। বিপরীতে সমাজ ও জীবনধারায় পরিবর্তন আনার প্রচেষ্টাও কম নয়। অজস্র ব্যক্তি ও সংগঠন ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষ্যে কাজ করছে। প্রত্যেকে নিজের সাধ্য ও সীমার মধ্যে কাজ করে যাচ্ছে। এসব সংগঠনের কাজের প্রভাবও দেখা যায় কোথাও কোথাও। তবে সামগ্রিক বিচারে সব প্রচেষ্টাই অর্থহীন মনে হয়। সামগ্রিক সামাজিক জীবনে তার উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাব দেখা যায় না; বরং নিরাশাই সর্বত্র প্রকট।

মানবসমাজের এই অবনতির পেছনে অনেক কারণই দায়ী এবং তা এত ব্যাপক যে আমরা চাইলেই তার কূল-কিনারা করতে পারব না। তাই এই লেখায় সামাজিক অবক্ষয়ের একটি দিক নিয়ে কথা বলব—যেদিকে আমাদের মনোযোগ নেই।

আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এমন আমরা অন্যের দোষ দেখে, অন্যের দোষ খুঁজে এবং অন্যের সমালোচনা করে আনন্দ পাই। অন্যের সমালোচনা আমাদের জন্য সময় কাটানোর মাধ্যম মাত্র। এসব দূর করার প্রকৃত উদ্যোগ খুব কম মানুষের ভেতর দেখা যায়। আর যারা পরিবর্তনের লক্ষ্যে কাজ করে, তারা অন্যের জন্য কাজ করে। যেন আমরা ছাড়া পৃথিবীর সব মানুষ খারাপ এবং তাদের সংশোধনের দায়িত্ব আমাদের দেওয়া হয়েছে। তবে এমন মানুষও আছেন, যাঁরা মনে করেন—আমাদেরও ত্রুটি আছে এবং সর্বপ্রথম তা সংশোধন করা আমাদের দায়িত্ব। কেননা যে পরিবর্তন চেষ্টায় নিজেকে উপেক্ষা করে শুধু অন্যদের লক্ষ্য বানানো হয়, তা অন্যের ওপর প্রভাব ফেলে না। তা লোক দেখানো কাজে পরিণত হয়।

সামাজিক অবস্থা ও মানুষের কর্মপদ্ধতির সমালোচনার সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক হলো সমালোচনাকারী ত্রুটি ও ক্ষতগুলো নিজের জন্য বৈধ বানিয়ে ফেলে। বহু সময় বলতে শোনা যায়—কাজটি তো বৈধ নয়, তবে যুগের অবস্থার জন্য করতে হয়। সমকালীন সব পাপাচারের বর্ণনা এমনভাবে করা হয়, যেন আমরা সব কিছুর ব্যাপারে নির্দোষ। এরপর একসময় সেসব কাজে নিঃসংকোচে লিপ্ত হয়, যার সমালোচনা নিজেরাই সারা জীবন করেছে।

আমাদের সামনে যদি কোনো ভয়ানক অগ্নিকাণ্ড ঘটে, যা সব কিছু গ্রাস করে নেবে, তা দেখেও কি আমাদের নিশ্চিন্তে বসে আক্ষেপ করা এবং নিশ্চল বসে থাকা উচিত হবে? বোকা ব্যক্তিও এমন পরিস্থিতিতে আগুনের সবিস্তার বিবরণ দেওয়ার আগে অগ্নিনির্বাপক বাহিনীকে খবর দেবে এবং নিজেও তা থেকে বাঁচার সর্বাত্মক চেষ্টা করবে। আগুন ছড়িয়ে পড়লে অন্তত নিজে নিরাপদ জায়গায় দিয়ে দাঁড়াবে। কেমন নির্বোধ হলে এটা করা সম্ভব যে, অন্যদের আগুন নেভাতে বলবে এবং নিজে তাতে জ্বালানি ফেলবে। যেসব সামাজিক পাপাচারের আগুন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে সেগুলোর ব্যাপারে আমাদের কর্মপদ্ধতি হলো আমরা প্রকাশ্যে তার সমালোচনা করি আবার নিজেও তাতে লিপ্ত হই। সুদ, ঘুষ, মিথ্যা, খেয়ানত ও অশ্লীলতার নিন্দা করি আবার সুযোগ পেলে তা নিজেরাই করি। এটা তো ছড়িয়ে পড়া আগুনে জ্বালানি দেওয়ার মতোই হলো।

কোনো সমাজে পাপাচার ব্যাপকতা লাভ করলে কোরআনের একটি মৌলিক নির্দেশনা হলো, ‘হে মুমিনরা! তোমাদের দায়িত্ব তোমাদের ওপর। তোমরা যদি সৎপথে পরিচালিত হও তবে যে পথভ্রষ্ট হয়েছে সে তোমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।’ (সুরা : মায়েদা, আয়াত : ১০৫)

এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় অন্যের পাপাচার কোনো পাপ কাজের অনুমোদন দিতে পারে না এবং অন্যের অন্যায় কাজের আলোচনা মানুষের কোনো উপকারে আসে না। মুমিনের দায়িত্ব হলো নিজেকে রক্ষা করা এবং সমাজ ও রাষ্ট্রকে অন্যায় থেকে বিরত রাখার যদি সুযোগ না থাকে অন্তত নিজে তা পরিহার করা। নিজের সবটুকু সামর্থ্য দিয়ে নিজেকে সংশোধন করবে। যে পাপ তাত্ক্ষণিকভাবে পরিহার করা যায়, তা সঙ্গে সঙ্গে পরিহার করবে এবং যা ছেড়ে দিতে সময়ের প্রয়োজন হয়, তা ছাড়ার চেষ্টা শুরু করবে। অন্যকে কোনো পাপ কাজ করতে দেখলে নিজে তা থেকে বিরত থাকার অঙ্গীকার করবে। কাউকে ঘুষ নিতে দেখলে নিজে ঘুষ না নেওয়ার, কাউকে খেয়ানত করতে দেখলে নিজে খেয়ানত না করার, কাউকে হারাম উপার্জন করতে দেখলে নিজে হারাম স্পর্শ না করার শপথ করবে। এক হাদিসে মহানবী (সা.) অনুরূপ নির্দেশনা দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘যখন দেখবে মানুষ কৃপণতা করছে, প্রবৃত্তির পেছনে ছুটছে, পার্থিব জীবনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, প্রত্যেকে নিজের মতামতে মুগ্ধ, এমন পরিস্থিতিতে সংশোধনে বিশেষ মনোযোগ দাও। সাধারণ মানুষের পথ পরিহার করো।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৩৪১)

এই হাদিসের উদ্দেশ্য হলো, এমন পরিস্থিতিতে মানুষের সমালোচনা করা কোনো সমাধান নয়; বরং সমাধান হলো প্রত্যেকে নিজেকে সংশোধন করার চেষ্টা করবে এবং ছড়িয়ে পড়া পাপাচার থেকে নিজে রক্ষার সর্বাত্মক চেষ্টা করবে। অন্য হাদিসে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি বলল, মানুষ ধ্বংস হয়ে গেছে সে বেশি ধ্বংসপ্রাপ্ত।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৪৭৫৫)

অর্থাৎ যে ব্যক্তি সব সময় অন্যের দোষ চর্চা করে এবং নিজের দোষ-ত্রুটির প্রতি ভ্রুক্ষেপ করে না, তার অবস্থাই সবচেয়ে শোচনীয়। বিপরীতে সে যদি অন্যকে দেখে শিক্ষা নেয় এবং নিজেকে সংশোধন করে, তবে সমাজ থেকে অন্তত একজন পাপীর সংখ্যা কমল। আর অভিজ্ঞতা বলে, সামাজিক জীবনে একটি প্রদীপ থেকে অন্য প্রদীপ প্রজ্বালিত হয় এবং এক ব্যক্তির সুপথে চলার কারণে অন্যরা অনুপ্রাণিত হয়। আর সমাজ যেহেতু ব্যক্তির সমষ্টি, তাই ব্যক্তির সংশোধনের চিন্তা প্রবল হলে ধীরে ধীরে সমাজ বদলে যাবে।

ভাষান্তর : আতাউর রহমান খসরু

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here