জগলু হত্যার রহস্য উন্মোচন, পরকীয়ার বলি

0
46

সমাজের মূল ভিত্তি হল পরিবার। বিবাহ হল প্রত্যেক ধর্মের পরিবার গঠনের পবিত্র বিধান। সে জন্য বিবাহ বহির্ভূত নারী-পুরুষের সম্পর্ক সকল ধর্মেই নিষিদ্ধ। এই পরকীয়া শুধু একটি সংসারকে ধ্বংস নয়, একটি সমাজ জাতি ও রাষ্ট্রকে কলুষিত করে দিতে পারে।

বিবাহের মত পবিত্র বন্ধনের মাধ্যমে যে সম্পর্কের সূচনা হয় বর্তমানে তা অনায়াসে ভেঙ্গে যাচ্ছে পরকীয়া নামক ব্যাধির কারণে। শুধু সংসার ভাঙা নয়, পরকীয়ার কারণে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটে থাকে।

এমনই একটি ঘটনা ঘটেছে যশোরে। ঝিনাইদহের এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীর গাড়িচালক এটিএম হাসানুজ্জামান ওরফে জগলু হত্যার রহস্য উন্মোচন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

শনিবার (৩১ আগস্ট) নিহতের স্ত্রী তাহমিনা পারভীন তমাকে (৩৭) গ্রেফতার করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি দুই পরকীয়া প্রেমিকের সহায়তায় স্বামীকে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন।

নিহত জগলু কুষ্টিয়া সদর উপজেলার জুগিয়া স্কুলপাড়া এলাকার মৃত জহুরুল আলমের ছেলে। গত ২৮ আগস্ট যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়কের চুড়ামনকাটি বারীনগর মাঝামাঝি এলাকার মাঠে লাশ পাওয়া যায়। রোববার সন্ধ্যায় এক বিজ্ঞপ্তিতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এমকেএইচ জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, শনিবার জগলু হত্যা মামলার আসামি তার স্ত্রী তাহমিনা পারভীন তমাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যার পরিকল্পনা ও মিশন বাস্তবায়নের কথা স্বীকার করেছে। দাম্পত্য কলহ ও পরকীয়ার জেরে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।

১৯৯৯ সালে নিহত এটিএম হাসানুজ্জামান জগলুর সঙ্গে তাহমিনা পারভীনের বিয়ে হয়। তাদের সংসার জীবনে দুই ছেলে মেয়ে আছে। স্বামী ২০০৮ সালে সাসপেন্ড হওয়ার পর সংসারে আর্থিক সংকট দেখা দেয়।

এর জের ধরে তাদের মধ্যে পারিবারিক কলহের সৃষ্টি হয়। তখন থেকে তাদের দাম্পত্য জীবনে বিপর্যয় ঘটে। তাহমিনা ঢাকায় বসবাসকালে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন।

গত ২৬ আগস্ট মিরপুর-১৩ নম্বরে তাহমিনা পারভীন তার ছেলের বাসায় গিয়েছিলেন। ওই দিন তাহমিনার সঙ্গে তার স্বামীর মোবাইল ফোনে ঝগড়া হয়। হাসানুজ্জামান তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে।

সন্ধ্যার পর ছেলের বাসার সামনে রাস্তায় নেমে এসে বন্ধু আলামিন ও মুরসালিনকে মোবাইল ফোন করে আসতে বলে। তারা দুজন আসলে হত্যার পরিকল্পনা হয়।

পরিকল্পনা অনুযায়ী আলামিন ও মুরসালিন মিরপুরের কোনো একটা ওষুধের দোকান থেকে পাতলা কাঁচের বোতলে চেতনানাশক ওষুধ নিয়ে আসে এবং ফাঁস দেয়ার জন্য দড়িও সংগ্রহ করে।

এরপর একটা উবারের গাড়ি ডাকে। কিছুক্ষণ পর গাড়ি আসে। গাড়ি চালকের বাড়ি খুলনা ডুমুরিয়া এলাকায়। সে তাহমিনা পারভীন ও তার বন্ধুদের পূর্ব পরিচিত। বিভিন্ন সময় তাদের প্রয়োজনে তাকেই ডেকে নেয়।

এরপর তাহমিনা পারভীন মুরসালিনের মোটরসাইকেলে ও আলামিন উবারের গাড়িতে কেরানীগঞ্জের বাসায় চলে যায়। ২৭ আগস্ট ভোর আনুমানিক ৫টার দিকে পাটুরিয়া ঘাট পার হয়ে ঝিনাইদহ হয়ে যশোরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করে।

বেলা সাড়ে ১১ টার দিকে তাহমিনাসহ তার বন্ধুরা যশোরে পৌঁছায়। ১২টার দিকে গাড়ি নিয়ে যশোর ‘জাবির ইন্টারন্যাশনাল’ হোটেলে যায়। তাহমিনা পারভীন আলামিন ও মুরসালিনের পরিচিত যশোরের একজনকেও হোটেলে দেখতে পায়। তারা সকলে লিফ্ট দিয়ে দো’তলায় রেস্টুরেন্টে যায়।

সেখানে তাহমিনা পারভীন ওয়াশরুমে ফ্রেশ হয়। রেস্টুরেন্টে খাওয়া-দাওয়া শেষে স্থানীয় ব্যক্তির বাসায় গিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে। এরপর তারা গাড়ি নিয়ে উবারের গাড়ির ড্রাইভারের বাড়িতে যায়।

এ সময়ে তাহমিনা পারভীনকে ফোন দেয় হাসানুজ্জামান জগলু। তখন তাহমিনা বলেন, থ্রী-পিচ ও কসমেটিকস মালামাল কেনার জন্য সে যশোরে এসেছে। তখন ভিকটিম হাসানুজ্জামান তার কাছে পঞ্চাশ হাজার টাকা চাইলে, তাহমিনা বলে বিশ হাজার টাকা দেয়া যাবে। কোথা থেকে টাকা নিবা?

তখন ভিকটিম হাসানুজ্জামান ঝিনাইদহ শামীমা ক্লিনিকের সামনে টাকা নেয়ার কথা জানায়। তাহমিনা ও তার বন্ধুরা যশোরে ঘুরাফেরা করে সময় কাটাই। সন্ধ্যার পরে ঝিনাইদহের উদ্দেশ্যে গাড়ি নিয়ে রওনা করে।

রাত অনুমান ১০টার দিকে ঝিনাইদহ শামীমা ক্লিনিকের সামনে পৌছায়ে তাহমিনা তার স্বামীকে গাড়িতে উঠিয়ে নেয়। ভিকটিম হাসানুজ্জামান পিছনের ছিটের মাঝখানে, আসামী তাহমিনা ভিকটিমের বামে এবং আলামিন ডানে বসে। মুরসালিন গাড়ির সামনের ছিটে বসে।

ঝিনাইদহ শহর পার হয়ে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী তাহমিনা পারভীন ও আলামিন দুইদিক থেকে ভিকটিমের দুই হাত ধরে। আলামিন চেতনানাশক ওষুধ তুলা ভিজিয়ে ভিকটিম হাসানুজ্জামানের নাকে চেপে ধরলে সে অচেতন হয়ে যায়। তখন আলামিন, মুরসালিন ও তাহমিনা পারভীন রশ্মি দিয়ে ভিকটিম হাসানুজ্জামানের গলা পেচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে।

ড্রাইভার গাড়ি যশোরে দিকে চালাতে থাকে। প্রায় ৪০মিনিট পথ যাওয়ার পর একটা ফাঁকা জায়গায় রাস্তার ডান দিকে গাড়ি থামিয়ে আলামিন ও মুরসালিন ভিকটিম হাসানুজ্জামানের লাশ গাড়ি থেকে টেনে নামিয়ে রাস্তার ডান পাশে ঢালে ফেলে দেয়।

মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য আলামিন ও মুরসালিন ছুরি দিয়ে জগলুর গলা কাটে। তাহমিনা পারভীন গাড়িতে বসে ছিল। এরপর আলামিন ও মুরসালিন তাড়াহুড়া করে গাড়িতে উঠে এবং ঢাকার দিকে রওনা দেয়।

ঢাকা যাওয়ার পথে মুন্সিগঞ্জে মুরসালিনের খালার বাসায় উঠে। সেখানে ড্রাইভার, আলামিন ও মুরসালিন গাড়ি ধুয়ে ফেলে। তাহমিনা পারভীনের পরনে থাকা পোশাক ওই বাসায় খুলে অন্য কাপড় পরে সকলে ঢাকা চলে যায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here