চিকিৎসা পাচ্ছেন না ফ্রন্টলাইনের আক্রান্ত চিকিৎসকরা!

0
26
চিকিৎসা পাচ্ছেন না ফ্রন্টলাইনের আক্রান্ত চিকিৎসকরা!

করোনা তথা কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে আক্রান্ত হচ্ছেন অনেক চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী। প্রাণ সংহারক এই মহামারির বিরুদ্ধে সম্মুখসমরে থাকা সংক্রমিত চিকিৎসকদেরই যথাযথ চিকিৎসা না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ফলে ফ্রন্টলাইনে থাকা অনেক চিকিৎসকের মধ্যে ভর করেছে আশঙ্কা আর অনিশ্চয়তা।

চিকিৎসকদের অভিযোগের বিষয়ে অবহিত সরকারি দল সমর্থক চিকিৎসকদের একটি কেন্দ্রীয় সংগঠন। তারা এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় দ্রুত ব্যবস্থা নেবে বলে আশা করছে।

বৈশ্বিক মহামারি কোভিড-১৯ দেশে প্রকোপ শুরু করার পর লড়াই করে যাচ্ছেন চিকিৎসকরা। শুরুর দিকে কিছু ক্ষেত্রে করোনার নির্ধারিত হাসপাতালে রোগীদের সেবা না পাওয়ার অভিযোগ থাকলেও পরিস্থিতি পরিস্থিতি ক্রমে উন্নতি হয়েছে। তবে আক্রান্ত রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে সংক্রমিত হচ্ছেন চিকিৎসকরাও। সম্প্রতি আক্রান্ত বেশ কয়েকজন চিকিৎসক উপযুক্ত চিকিৎসা পাননি বলে অভিযোগ ওঠে।

সবশেষ গত সোমবার করোনা উপসর্গ নিয়ে লৎফুল কবির শিমুল নামের চট্টগ্রামের ম্যাক্স হাসপাতালের একজন চিকিৎসক গুরুতর অভিযোগ করেন, ওই হাসপাতালে তার মালিকানাও রয়েছে। একই হাসপাতালে চেম্বার করেন শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ তার চিকিৎসক স্ত্রীও। সংকটময় সময়ে একটি কেবিন আর বেঁচে থাকার জন্য একটি অক্সিজেন এমনকি প্রতিষ্ঠানের এমডির কাছেও কোনো সহযোগিতা পাননি বলে অভিযোগ শিমুলের।

তার এই মর্মান্তিক ঘটনা সবিস্তারে ফেসবুকে পোস্টে লিখেছেন ডা. শিমুল। মিরসরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পদায়ন হলেও তিনি সংযুক্ত আছেন চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের কনসালট্যান্ট হিসেবে।

বাংলাদেশ ডক্টরস ফাউন্ডেশনের (বিডিএফ) তথ্য মতে, এ পর্যন্ত দেশে করোনায় ১০ চিকিৎসকের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে বেশ কয়েকজন নিজ নিজ সেক্টরে দক্ষ ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, পেশাগত জীবনে মানুষকে সেবা দিলেও শেষ সময়ে তারা ভালো চিকিৎসা পাননি।

এই তালিকায় সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল রয়েছে। চিকিৎসকদের স্বার্থ রক্ষার্থে কাজ করা সংগঠনগুলোর নেতারা এজন্য দায়ী করছেন হাসপাতালগুলোর পরিচালক কিংবা মালিকপক্ষকে।

এমন পরিস্থিতির উত্তরণের জন্য শুধু চিকিৎসকদের জন্য হাসপাতালের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছে বিডিএফ। এটা করা সম্ভব হলে চিকিৎসকদের চিকিৎসা না পাওয়ার সমস্যা অনেকটা কেটে যাবে।

বিএসএমএমইউয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। এটা মেনে নেওয়ার মতো নয়। যারা এমনটা করছেন তারা অন্যায় করছেন। জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’

তার মতে, সব হাসপাতালে সুষ্ঠুভাবে চিকিৎসা সেবা চালু করতে না পারাও এর জন্য অনেকাংশে দায়ী। এছাড়া চিকিৎসকরাও নানাভাবে ঝামেলায় পড়ছেন, যেটা কাম্য নয়। তাছাড়া হাসপাতালগুলোর আইসিইউ পরিচালনার জন্য চিকিৎসক ও নার্সের পাশাপাশি এনেশথেশিস্ট নিয়োগ দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিএসএমএমইউয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম।

করোনা আক্রান্ত চিকিৎসকরা উপযুক্ত সেবা না পেলে সেটা সবার জন্যই বিপদ বলে মনে করছেন সরকারি দল সমর্থক স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান।

চিকিৎসকদের অভিযোগের বিষয়ে তিনি ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘আমরা এমন ঘটনা শুনছি। ইতোমধ্যে দায়িত্বশীলদের অবহিতও করা হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী, সচিব এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আশা করি বিষয়গুলো সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ নেবেন। দেশের এই ক্রান্তিকালে ফ্রন্টলাইনের যোদ্ধারা মর্মাহত হতে হতে এক পর্যায়ে ক্ষুব্ধ হলে সবার জন্য বিপদ ডেকে আনবে।’

দেশে প্রথম করোনায় প্রাণ হারান এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. মঈন। ওই অঞ্চলে ‘গরিবের ডাক্তার’ বলে পরিচিতি পাওয়া এই চিকিৎসক করোনায় আক্রান্ত হয়ে গত ১৫ মে ঢাকার কুর্মিটোলা হাসপাতালে মারা যান।

সহকর্মী ও স্বজনদের অভিযোগ ছিল, সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক হয়েও তিনি নিজের প্রতিষ্ঠানের আইসিইউ ও সরকারি অ্যাম্বুলেন্স পাননি। সিলেটে চিকিৎসা না পেয়ে তাকে ঢাকা আসতে হয়।

দ্রুততার জন্য হেলিকপ্টারে ঢাকা আনার চেষ্টা করা হলেও সেক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সহযোগিতা মেলেনি বলেও অভিযোগ তার সহকর্মীদের। এই ঘটনায় তখন নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠে। ওসমানী মেডিকেল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ারও দাবি উঠেছিল।

করোনায় মারা যাওয়া গাইনী বিশেষজ্ঞ ডা. আমিনা খানের সঠিক চিকিৎসা না পাওয়ার চিত্র সামনে বসেই দেখেছেন তার চিকিৎসক মেয়ে বর্ণা সিদ্দিকা। গত ২৬ মে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডা. আমিনা মারা যান।

বর্ণা সিদ্দিকা মায়ের কষ্টের দিনগুলোর কথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করলেও তার কোনো অভিযোগ নেই বলে জানান। তিনি বলেছেন, আইসিইউতে যারা কাজ করেছেন তারা বেশিরভাগই দক্ষ নন। সময়মতো ডেকেও চিকিৎসক ও নার্সদের দেখা মেলেনি।

ডা. সুস্মিতা আইচের অভিজ্ঞতা পুরোপুরি ভিন্ন। করোনার উপসর্গ থাকায় তার বাবা অতিরিক্ত সচিব গৌতম আইচ সরকারের চিকিৎসার জন্য এমন কোনো নামীদামী হাসপাতাল নেই যেখানে তিনি ছোটাছুটি করেননি। বহু চেষ্টায় বাবার চিকিৎসা না মেলায় শেষ পর্যন্ত কুর্মিটোলাতে ঠাঁই হয়। তবে সেখানেও যথাযথ সেবা মেলেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। গত ৯ মে গৌতম আইচ মারা যান।

নিজে চিকিৎসক হয়েও বাবার জন্য কিছু করতে না পারার আক্ষেপ প্রকাশ করে সুস্মিতা বলেছিলেন, ‘আমি চিকিৎসক হয়েও বাবার জন্য কিছু করতে পারিনি।’

রাজধানীর বাইরে বিভাগীয় শহরগুলোতেও চিকিৎসকদের সেবা না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। চট্টগ্রামের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লুৎফুল কবির ম্যাক্স হাসপাতালে চিকিৎসা না পাওয়ার পর অভিযোগ তোলায় হাসপাতালটির কর্তৃপক্ষ তাকে মামলার হুমকি দিয়েছে বলে জানা গেছে।

এই চিকিৎসক বলেন, ‘কোভিড নিয়ে যুদ্ধ করে এখন কিছুটা সুস্থ। আমার চিকিৎসাকালীন সময়ে আমারই প্রাইভেট কনসালটেশনের হাসপাতালে ভর্তি হয়ে অক্সিজেন এবং সাপোর্টিভ থেরাপি নিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এমডি ভর্তি নিলো না বরং এলোমেলো কথা বলল। পরবর্তীতে এই ঘটনাগুলো নিয়ে পোস্ট করায় সে আমাকে মামলার হুমকি দেয়।’

এদিকে সোমবার করোনায় প্রাণ হারান বিশিষ্ট বক্ষব্যাধি চিকিৎসক ওয়াহেদুজ্জামান খন্দকার। মুগদা হাসপাতালে আইসিইউতে তার মৃত্যু হয়। অনেক চেষ্টা করেও ওই হাসপাতালে একটি কেবিন পাননি এই চিকিৎসক।

বিডিএফের সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. কাওসার আলম ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘চিকিৎসকদের চিকিৎসা না পাওয়া খুবই দুঃখজনক ও চরম হতাশার। এটার জন্য দায়ী প্রতিটি হাসপাতালের পরিচালকদের অব্যবস্থাপনা ও অতিরিক্ত মাত্রায় ফ্রন্টলাইনারদের প্রতি অবহেলা।’

হাসপাতালে কেবিন ফাঁকা থাকা স্বত্ত্বেও পরিচালকরা চিকিৎসকদের কেবিন দিতে গড়িমসি করেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যেন ভিআইপিরা অসুস্থ হওয়ার জন্য অপেক্ষায় থাকেন। তাদেরকে দেওয়ার জন্য এই কেবিন বরাদ্দ রাখেন।’

চিকিৎসকদের চিকিৎসা দিতে একটি আলাদা হাসপাতাল বরাদ্দ করার জন্য বিডিএফ সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here