গলার কাটা অংশ হাতে চেপে দৌড়, তবুও বাঁচতে পারলেন না

0
202

মো. মিলন মিয়া (৩৫)। পেশায় ছিলেন একজন প্রাইভেটকার চালক। দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে থাকতেন রাজধানীর মিরপুর এলাকায়। সংসারের খরচ চালাতে রাতে মোটরসাইকেল দিয়ে রাইড শেয়ারিং অ্যাপসের মাধ্যমে যাত্রীসেবা দিতেন।

প্রতিদিনের মতো রবিবার (২৫ আগস্ট) রাতে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়েছিলেন মিলন। রাত সোয়া দুইটার দিকে রাইড শেয়ারে যাত্রী নিয়ে মালিবাগ থেকে শান্তিনগরের দিকে যাচ্ছিলেন তিনি। উড়ালসড়কে ওঠার পরপরই মিলনের গলায় ছুরি দিয়ে আঘাত করে যাত্রীবেশী দুর্বৃত্ত। ছুরির আঘাতে বড় ক্ষতের সৃষ্টি হয় তার গলায়। এমনকি কেটে যায় শ্বাসনালীও।

প্রাণ বাঁচাতে নিজের কাটা গলায় হাত দিয়ে চেপে ধরে ফ্লাইওভার থেকে নিচে দৌড়ে নামেন মিলন। সেখানকার স্থানীয় জনতা এবং পুলিশের সহযোগিতায় তাকে দ্রুত নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে।

অবস্থার আরও অবনতি হলে তাকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়। পরে সেখানেই মারা যান মিলন। পরে ময়নাতদন্তের জন্য তার লাশ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়।

পুলিশ ও মিলনের আত্মীয়স্বজনদের ধারণা, মিলনের সঙ্গে থাকা যাত্রীই তাকে হত্যা করে থাকতে পারে। হত্যার পরই ঘাতক ব্যক্তি মিলনের মোটরসাইকেল (ঢাকা মেট্রো ল ২৬-৪১২৬) ও মোবাইল ফোন সেট নিয়ে পালিয়ে যান। এ ঘটনায় আজ দুপুরে শাজাহানপুর থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন মিলনের স্ত্রী শিল্পী।

মিলন রাজধানী ঢাকার মিরপুর এলাকার গুদারাঘাট এলাকায় স্ত্রী শিল্পী, ১০ বছরের ছেলে মিরাজ ও ৫ বছরের মেয়ে সাদিয়াকে নিয়ে থাকতেন। মিরপুরে তার পাশের বাড়িতে থাকেন বন্ধু সিএনজি অটোরিকশা চালক সিরাজ। কোনো ট্রিপ নিয়ে যাওয়ার আগে সব সময় নিজেদের মধ্যে কথা বলতেন মিলন ও সিরাজ।

গতকাল দিবাগত রাতে তাদের দুজনেরই সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে যাওয়ার কথা ছিল। সবশেষ রাত দুইটা ১২ মিনিটে মিলনের সঙ্গে কথা হয় সিরাজের। এর ২৩ মিনিট পর সিরাজ জানতে পারেন যে মিলনের গলা কেটে তার মোটরসাইকেল নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা।

সিরাজ জানান, তাদের বাসা মিরপুরের গুদারাঘাট এলাকায়। মিলনের সঙ্গে তার সব সময়েই যোগাযোগ হতো। তিনি অটোরিকশা চালানোর সময়ে কোথায় আছেন, বা মিলন কোথায় আছে-এসব বিষয়ে কথা হতো। রবিবার রাত ১২টা ৩৬ মিনিটে, এরপর পৌনে একটা এবং সবশেষ রাত দুইটা ১২ মিনিটে মিলনের সঙ্গে তার সর্বশেষ কথা হয়। ওই সময়ে মিলন তাকে জানিয়েছিলেন, তিনি ১০০ টাকা ভাড়ায় যাত্রী নিয়ে মালিবাগে সিআইডি কার্যালয়ের সামনে এসেছেন। যাত্রী নামিয়ে সদরঘাটে যাবেন। তখন তিনি তাকে জানান উত্তরা থেকে অটোরিকশা নিয়ে সদরঘাটে যাবেন। নাশতা করে ভোরে দুইজনেই লঞ্চের যাত্রী নিয়ে ফিরবেন। তবে রাত দুইটা ৩৬ মিনিটে মিলনের আরেক বন্ধু হিমেল ফোন দিয়ে ঘটনা জানায়।

ঘটনার তদন্তকারী কর্মকর্তা শাজাহানপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আতিকুর রহমান বলেন, রাইড শেয়ারিংয়ে যাত্রী নিলেও মিলন ঘটনার আগে অ্যাপস ব্যবহার করেননি। তিনি উবার, পাঠাওয়ে রাইড শেয়ারিং করতেন। সর্বশেষ গত ৭ আগস্ট উবারে যাত্রী বহন করেছিলেন মিলন। গতকাল রাতে মিলন আবুল হোটেলের প্রান্ত দিয়ে উড়ালসড়কে ওঠেন। মালিবাগ থেকে শান্তিনগরে যাওয়ার পথে পদ্মা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ভবনের সামনে উড়ালসড়কে মিলনকে ছুরিকাঘাত করা হয়।

অ্যাপসের মাধ্যমে যাত্রী বহন করলে ঘটনার বিস্তারিত জানা সম্ভব হতো বলে জানান এসআই আতিকুর রহমান। তিনি বলেন, অ্যাপস ব্যবহার না করে রাইড শেয়ারে মোটরসাইকেল চালকেরা চুক্তিতে যাত্রী নিয়ে থাকেন। মিলন হয়তো চুক্তিতে যাত্রী নিয়ে শান্তিনগরের দিকে যাচ্ছিলেন। এ সময় ছুরিকাঘাত করে মিলনের মোটরসাইকেল ও মোবাইল ফোন সেটটি নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। অ্যান্টি কাটার দিয়ে মিলনের গলার ডান দিক থেকে টান দিয়ে বামপাশ কাটা হয়। ছুরিকাঘাতে তার গলায় তিন ইঞ্চি গভীর ক্ষত হয়। শিরা কেটে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মিলন মারা যান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here